Home » ফিচার2 » রাজধানীর যানজট সমস্যা সমাধানে কয়েকটি প্রস্তাবনা

রাজধানীর যানজট সমস্যা সমাধানে কয়েকটি প্রস্তাবনা

517 বার পঠিত

যানজট রাজধানী ঢাকার দেড় কোটি মানুষের মেগাসিটিকে স’বির করে দিচ্ছে। প্রতিদিন যানজটে লাখ মানুষের হাজার হাজার শ্রমঘণ্টা নষ্ট হচ্ছে। জ্বালানি অপচয় হচ্ছে। দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন ব্যাহত হচ্ছে। রাজধানী ক্রমান্বয়ে অচল নগরীতে পরিণত হচ্ছে। জনসংখ্যার তুলনায় রাসত্মার স্বল্পতা এবং স্বল্পগতির অযান্ত্রিক যানবাহনের আধিক্যকে এ স’বির অবস্থার জন্য দায়ী করা হয়।  ট্রাফিক আইন না মানা, পরিকল্পনার অভাব, ফুটপাথ দখল, প্রাইভেট কারের সংখ্যা স্পুটনিক গতিতে বৃদ্ধি পাওয়াও যানজটের অন্যতম প্রধান কারণ। তবে সামপ্রতিক সময়ে যানজটের কারণ হিসেবে ভাঙাচোরা রাস্তা এবং কারণে-অকারণে রাস্তা খোঁড়াখুঁড়িকেও দায়ী করা হচ্ছে। যেখানে-সেখানে পার্কিং, ফুটপাথ দখল করে দোকান বসানো ইত্যাকার সমস্যা তো বহু পুরনো। কিছুতেই রাজধানীর যানজট সমস্যার সমাধান হচ্ছে না। যানজট পরিস্থিতি দিনই দিনই জটিল হচ্ছে ।

রাজধানীতে যানজটের কারণে বছরে বাণিজ্যিক ক্ষতি ২১ হাজার কোটি টাকার বেশি। প্রতিদিন এর পরিমাণ ৮৩ কোটি। এছাড়া প্রতি কর্মদিবসে নষ্ট হচ্ছে ৩২ লাখ কর্মঘণ্টা, যা একজন মানুষের ক্ষেত্রে তিন ঘণ্টা। পাবলিক ট্রান্সপোর্ট থেকে রাজস্ব গচ্চা যাচ্ছে দুই হাজার কোটি টাকা। যানজটের কারণে রাজধানীতে পরিবহন প্রবেশ করতে না পারায় প্রতিদিন বিভিন্ন খাত থেকে প্রায় দুই হাজার কোটি টাকা আয় নষ্ট হচ্ছে। সব মিলিয়ে যানজটের কারণে দিনে আর্থিক ক্ষতি প্রায় ১০০ কোটি টাকা। এছাড়া সকাল ৮টা থেকে রাত আটটা ১২ ঘণ্টায় রাজধানীতে চলাচলকারী যানবাহনকে যানজটের কারণে প্রায় সাড়ে সাত ঘণ্টা আটকে থাকতে হয়। এ মধ্যে প্রতিদিন ঢাকার রাস্তায় নামছে প্রায় ২০০ বিভিন্ন ধরনের পরিবহন। আগামী ২০৩০ সালে ঢাকায় জনসংখ্যা হবে ৩০কোটি। এই প্রেক্ষাপটে যানজট নিরসনে উদ্যোগ নেয়ার সময় এখনই।

আমাদের যতটুকু সড়ক পথ আছে তাতে বর্তমান প্রেক্ষাপটে নানাবিধ পদক্ষেপ নিলে যানজট ৮০ ভাগ কমিয়ে আনা সম্ভব। আমরা বিশ্বের বড় বড় শহর এমনকি হজ্বকালীন সময় মক্কা মদিনা, অলিম্পিক গেমসহ নানা বড় আসরের সময় ট্রাফিক নিয়ন্ত্রন ব্যবস্থার দিকে লক্ষ করলে দেখা যাবে সে সময় কত সহজেই না যানজট নিয়ন্ত্রন করছে সংশিস্নষ্ট দেশগুলো। অলিম্পিকের মত আসরে দিন গুনে জোড় বেজোর নাম্বারের প্রাইভেট গাড়িগুলো চলাচল করতে দিচ্ছে। এক দিন জোড় সংখার গাড়িগুলো রাস্তায় চলার অনুমতি পাচ্ছেতো পরদিন পাচ্ছে বেজোড় সংখ্যার গাড়িগুলো। বিশেষ মুহুর্তগুলোতে বাহিরের শহরের গাড়িগুলো শহরে ঢোকার অনুমোতি পাচ্ছে না। সে ক্ষেত্রে পূর্ব থেকেই সরকারের পক্ষ থেকে পত্রপত্রিকায় ঘোষনা দেয়া হচ্ছে ফলে দুর্ভোগ হচ্ছে না, হচ্ছে না যানজটও। বিশেষ সময়ে  জোড় বেজোড় গাড়িগুলো রাজধানীতে চলাচলের ক্ষেত্রে দিন গুনে চলাচল করতে দেয়া যেতে পারে। ঢাকা মহানগীর যানজট, পার্কিং সমস্যা, পরিবেশ দূষণ ও জনদুর্ভোগের প্রেক্ষিতে আশু করণীয় হলো পার্কিং চাহিদা নিয়ন্ত্রণের জন্য নীতিমালা প্রণয়ন, বিনামূল্যে পার্কিং বন্ধ করা এবং অবৈধ পার্কিংয়ের জন্য জরিমানার ব্যবস্থা করা, সর্বত্র জায়গা ও সময়ের মূল্যানুসারে পার্কিং ফি নেয়া, পার্কিং থেকে প্রাপ্ত অর্থ পাবলিক পরিবহনের মানোন্নয়নে ব্যয় করা।

নগরের ব্যস্ততম এলাকায় প্রাইভেট গাড়ি চলাচলের ক্ষেত্রে কনজেশন চার্জ গ্রহণ করা, প্রাইভেট কারের লাইসেন্স সীমিত করা, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও অফিস আদালতে প্রাইভেট গাড়ির পরিবর্তে পাবলিক পরিবহনের ব্যবস্থা করা, প্রইভেট গাড়ি নির্ভর অবকাঠামো (ফ্লাইওভার, পার্কিয়ের স্থান তৈরি) নির্মাণ না করা। পাবলিক পরিবহন, জ্বালানিমুক্ত যান ও পথচারীদের সুবিধা বৃদ্ধি করা। জায়গা ও সম্পদের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করা ও প্রাইভেট গাড়ির পার্কিং সমস্যা সমাধানে পার্কিংয়ের জন্য সময় ও স্থান অনুসারে অর্থ গ্রণই যুক্তিযুক্ত।

যানজট নিরসনে বড়বড় প্রকল্প হাতে না নিয়ে রাজধানী ও তার আশেপাশে কয়েকটি  মিনি ফ্লাইওভার নির্মাণ করা যেতে পারে। সংযোগ সড়ক গুলোতে ফ্লাইওভার নির্মাণ করা হলে যানজট অনেকাংশে কমে যাবে বলেই বিশ্বাস রাখি। (১) পল্টন সংযোগ সড়কের উপর মিনি ফ্লইওভার, (২) মতিঝিল সংযোগ সড়কের উপর মিনি ফ্লইওভার ,(৩) সায়দাবাদ রেল ক্রসিং এর উপরে, (৪) জনপথ মোড়, (৫) যাত্রাবাড়ী মোড়, (৬) চিটাগাং রোড, (৭) কাঁচপুর সংযোগ সড়ক, (৮) কাওরান বাজার সংযোগ সড়ক, (৯) শেরাটন হোটেল সংযোগ সড়ক, (১০) শাহবাগ সংযোগ সড়ক (১১) কুড়িল বিশ্বরোড সংযোগ সড়কের উপরে, (১২) বনানী ষ্টাফ গেট রেল ক্রসিং এর উপরে, (১৩) বনানী সংযোগ সড়কের উপরে, (১৪) ক্যান্টনম্যান্ট সংযোগ সড়ক, (১৫) মহাখালী সংযোগ সড়ক, (১৬) বিজয় স্মরণী সংযোগ সড়ক, (১৭) খামারবাড়ী-ফার্মগেট সংযোগ সড়কসহ আনুমানিক ১৬/১৮টি মিনি ফ্লাইওভার নির্মাণ করা হলে স্বাভাবিক গতিতে যানজট ছাড়াই ঐসব রম্নটের গাড়ী গুলো নিরবচ্ছিন্ন ভাবে চলতে পারবে। সংযোগ সড়কের গাড়ী গুলো নিচে দিয়ে ক্রস করতে পারবে এবং ঐ স্থানে প্রধান সড়কের গাড়ীগুলো সিগন্যালের অপেক্ষা না করে মিনি ফ্লাইওভারের মাধ্যমে উপর দিয়ে চলে যেতে পারবে।

সরকারের বর্তমান পরিকল্পনা অনুযায়ী ২৬কিঃমিঃ এলিভেটেড নির্মাণ না করে শুধু মাত্র প্রস্তাবিত সিগন্যাল পয়েন্ট/তিন রাস্তা/চার রাস্তার মোড়ে মিনি ফ্লাইওভার নির্মাণ করলে ২৬কিঃমিঃ এর কাজ না করে মিনি ফ্লাইওভার প্রযুক্তিতে আনুমানিক ৬ কিঃ মিঃ এর কাজ করলেই প্রকৃত ভাবে যানজট নিরসন সম্ভব এবং বেশিরভাগ যানবাহনই সুবিধা ভোগ করতে পারবে। এত প্রায় ৫ গুন অর্থ কম ব্যয় ও ব্যাপক সুফল পাওয়া সম্ভব হবে বলে আমি বিশ্বস করি। ফলে সরকারের কয়েক হাজার কোটি সাশ্রয়, দীর্ঘ সময় সাশ্রয় এবং একটি রুটের চারদিকের যানজট নিরসন সম্ভব যা একটি এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে/ফ্লাইওভারের পক্ষে সম্ভব নয়। এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে/ফ্লাইওভার ঐ রম্নটের চারিদিকের সমাধান দিতে পারে না। এর প্রকৃত প্রমাণ টঙ্গী ওভারপাস, খিলগাঁও, মহখালী ফ্লাইওভার এবং ফ্লাইওভারের নিচে-উপরেও যানজট বিদ্যমান।

যানজটের কবল থেকে ঢাকাকে রক্ষা করতে ঘনঘন মেট্রো ট্রেন সার্ভিস, পাতাল রেল, ট্রানজিট সুবিধা, পার্কিং মিটার, দ্বিতল বাস সার্ভিস চালুর বিকল্প নেই। সেই সঙ্গে স্থানীয় সরকার ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের ক্ষমতায়ন জরুরী। অন্যথায় পরিস্থিতি সামাল দেয়া সম্ভব হবে না। এছাড়া প্রাইভেটকার, রিক্সা, বেবিট্যাক্সিসহ বিভিন্ন পরিবহনের ওপর নিয়ন্ত্রণ আনতে হবে। মতিঝিলকে বাণিজ্যিক জোন ঘোষণা করে বাস ছাড়া সকল পরিবহন বন্ধ করে দিতে হবে।

রাজধানী ঢাকার মোট আয়তনের ৬/৭ ভাগ রাস্তা। আন্তর্জাতিক নিয়ম অনুযায়ী রাস্তা ২৫/৩০ ভাগ থাকার কথা থাকলেও ঢাকায় তা নেই। যেটুকু রাস্তা আছে এর অনেকাংশই দখলে। ফেরিওয়ালা, যত্রতত্র পার্কিংসহ অবৈধ স্থাপনার দখলে চলে গেছে রাজধানীর অনেক রাস্তাই। এছাড়া প্রায় ৩০ ধরনের যান্ত্রিক ও অযান্ত্রিক যানবাহন যার প্রত্যেকটির গড় গতিবেগ আলাদা হলেও ঢাকার রাস্তার একসঙ্গে চলে। যানজটের পেছনে এটি একটি অন্যতম কারণ। ঢাকা সিটি করপোরেশন ও বিআরটিএ সূত্রে জানা গেছে, ঢাকা শহরে ইঞ্জিন চালিত যানবাহনের সংখ্যা ৭২ লাখ সাত হাজার ২৮৫। ২০০৩ সালে এর সংখ্যা ছিল ৩০ লাখ তিন হাজার ২১৫টি। অর্থাৎ ৯ বছরে রাজধানীতে যানবাহনের সংখ্যা বেড়েছে ৪২ লাখের বেশি। কারের সংখ্যা এক লাখ ৪৭ হাজার ২৮৩, জীপ পাঁচ লাখ ৮ হাজার ৬০৮, ট্যাক্সি এক লাখ ৬৮২টি, বাস আট হাজার ২১০, মিনিবাস আট হাজার ৩১৭, ট্রাক ৩০ হাজার ১৫টি, সিএনজি ও থ্রি গুইলার ১৪ হাজার ৮২০টি, মোটরসাইকেল ২ লাখ ১৯ হাজার ৪৪৩টি, ইঞ্জিনচালিত অন্যান্য গাড়ি প্রায় ৩০ হাজার। সিটি করপোরেশন থেকে লাইসেন্স প্রাপ্ত রিক্সার সংখ্যা বৈধ অবৈধ মিলিয়ে পাঁচ লাখের বেশি। এর মধ্যে বেশিরভাগই লাইসেন্সের আওতার বাইরে। এই প্রেক্ষাপটে ঢাকায় প্রকৃত অর্থে পরিবহনের সংখ্যা কত তা নির্ধারণ করা কঠিন।

এছাড়া যানজট নিরসন ও জনপরিবহনে শৃঙ্খলা আনতে ঢাকা যানবাহন সমন্বয় বোর্ডকে (ডিটিসিবি) আনুষ্ঠানিক দায়িত্ব দেয়া হলেও কাজের কাজ কিছুই হচ্ছে না। সরকারের পক্ষ থেকে সংশ্লিষ্টদের যথাযথ দায়িত্ব না দেয়ার কারণে বোর্ডের পক্ষ থেকে বিভিন্ন সময় উদ্যোগ নেয়া হলেও তা বাস্তবায়ন করা সম্ভব হচ্ছে না।
রাজধানীর যানজট সহনীয় মাত্রায় আনতে স্বল্প গতির যানবাহন ও প্রাইভেটকারের সংখ্যাধিক্যের দিকে নজর দেয়া দরকার। ট্রাফিক আইন যাতে সব ক্ষেত্রে কড়াকড়িভাবে মানা হয় সে ব্যাপারেও যত্নবান হতে হবে। ফুটপাত থেকে দোকানপাট উঠিয়ে দেয়া, যেখানে-সেখানে গাড়ি পার্কিং বন্ধে ব্যবস্থা নেয়া এবং দিনের ব্যস্ত সময়ে প্রাইভেটকার চলাচল কমিয়ে আনার কথাও ভাবতে হবে।

রাজধানীতে জনসংখ্যার তুলনায় সড়কের সংখ্যা এমনিতেই কম। তারপরও রয়েছে স্বল্পগতির রিকশা ও প্রাইভেটকারের আধিক্য। ফুটপাত দখল করে দোকানপাট চালানো কিংবা রাসত্মায় যেখানে- সেখানে গাড়ি পার্কিং এ মেগাসিটিতে একটি নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। যানজট সৃষ্টির অন্যতম কারণ হলো প্রাইভেট গাড়ির অপরিকল্পিত পার্কিং। ঢাকার প্রায় সব সড়কেই নিয়ন্ত্রণহীনভাবে চলছে গাড়ি পার্কিং। ফলে সড়কে যানবাহন চলাচলের জায়গা কমে যানজট সৃষ্টি হচ্ছে। আবার পার্কিংয়ে কোনো নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা না থাকায় মানুষ প্রাইভেট গাড়ি ব্যবহারে আরো উৎসাহিত হচ্ছে। গাড়ি বাড়ছে, বাড়ছে পার্কিং সমস্যাও। পার্কিং সমস্যা নিরসনে ইতিপূর্বে বিভিন্ন পদক্ষেপ নেয়া হলেও সমাধান মেলেনি। যানজট নিয়ন্ত্রণ, সম্পদ ও জায়গার যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করতে পার্কিং সমস্যার দীর্ঘস্থায়ী সমাধান বের করা জরুরি। রাজধানীর যানজট নিরসনে সঠিক পরিকল্পনা এবং সঠিক সিদ্ধান্তের অভাব দেখা যায়। পার্কিং সমস্যা নিরসনে প্রাইভেট গাড়ি নিয়ন্ত্রণের বিকল্প কিছু নেই। ঢাকার রাস্তা, ফুটপাত, খেলার মাঠ, পার্ক সর্বত্রই প্রাইভেট কার পার্কিংয়ের জন্য নামমাত্র মূল্যে বা বিনামূল্যে জায়গা বরাদ্দ রয়েছে। এছাড়া ভবনে আবশ্যিকভাবে কার পার্কিংয়ের জন্য জায়গা রাখা ও পার্কিংয়ের জন্য ভবন নির্মাণ করে শহরে প্রাইভেট কারকে আমন্ত্রণ জানানো হচ্ছে। মতিঝিল এলাকায় নির্মিণাধীন সিটি সেন্টারে ৫০০ প্রাইভেট কার পার্কিংয়ের ব্যবস্থা করতে ১০টি ফ্লোর বরাদ্দ রাখা হয়েছে। এছাড়া ইমারত নির্মাণ বিধিমালায় প্রতিটি ভবনে প্রাইভেট কারের পার্কিং সুবিধা রাখা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। যার ফলে ভবিষ্যতে প্রাইভেট কার বৃদ্ধি পাবে। ঢাকা সিটি করপোরেশনের হিসাব মতে মতিঝিল-দিলকুশা এলাকায় প্রতিদিন প্রায় চার হাজার প্রাইভেট কার পার্কিং করা হয়। প্রাইভেট কার নিয়ন্ত্রণ না করা হলে এবং সেই সঙ্গে বিকল্প পরিবহন সুবিধা দিতে না পারলে শুধুমাত্র পার্কিং সুবিধা বৃদ্ধি করে যানজট নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। জনসমাগম স্থলে গাড়ি পার্কিং করা হলে মানুষের চলাফেরা ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা নষ্ট হয়। আমরা চাইলেই ফুটপাত বা রাস্তায় ব্যক্তিগত জিনিস রাখতে পারি না। অথচ সর্বত্রই প্রাইভেট গাড়ি পার্কিংয়ের জন্য রাস্তা এবং ফুটপাত ব্যবহার করা হচ্ছে। ফুটপাত ও রাস্তায় গাড়ি পার্কিং করায় মানুষের চলাচল বিঘ্নিত হয়, আশপাশের ব্যবসা কেন্দ্রের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে, জনসাধারণের অবাধ বিচরণের অধিকার খর্ব হয়।

পার্কিং খরচ বাড়ানো প্রাইভেট গাড়ি নিয়ন্ত্রণ তথা পার্কিং সমস্যা সমাধানেরও একটা কার্যকর উপায় হতে পারে। পার্কিংয়ের জন্য জায়গা ও সময়ের মূল্যানুসারে ফি দিতে হলে মানুষ প্রাইভেট গাড়ি ব্যবহারে নিরুৎসাহিত হবে এবং রাস্তায় গাড়ির সংখ্যা কমায় যানজটও কমে আসবে। পাশাপাশি সময়ের অপচয়, জ্বালানির ব্যবহার, দুর্ঘটনার হার, শব্দ ও বায়ুদূষণও হ্রাস পাবে। পার্কিং ফি বৃদ্ধি পেলে অনেকেই নতুন গাড়ি কেনা থেকে বিরত থাকবেন। তাহলে নতুন করে পার্কিং অবকাঠামো নির্মাণের চাহিদা হ্রাস পাবে। এতে অর্থ ও জায়গা দুইয়েরই সাশ্রয় হবে। রাজস্ব আয় বাড়বে। শহর আরো সুন্দর ও মানুষের বসবাস উপযোগী হবে। আবার পার্কিং ফি বেশি হলে মানুষ পার্কিং প্লেসে কম সময়ের জন্য গাড়ি রাখবে। এতে অল্প জায়গায় অনেক বেশি গাড়ি পার্কিংয়ের সুবিধা পাবে। ৫টি গাড়ির ধারণ ক্ষমতা সম্পন্ন পার্কিং প্লেসে এক ঘণ্টা পরপর গাড়ি পরিবর্তন হলে ১২ ঘণ্টায় ৬০টি গাড়ি রাখা সম্ভব। পার্কিং ফি বৃদ্ধি পেলে মানুষ কর্মস্থলে যাওয়ার ক্ষেত্রে প্রাইভেট কার ব্যবহারে নিরুৎসাহিত হবে। ঘণ্টায় ৫০ টাকা পার্কিং ফি নির্ধারণ করা হলে প্রতিদিন একজন গাড়ি ব্যবহারকারীকে ৮ ঘণ্টার জন্য ৪০০ টাকা দিতে হবে। এর সঙ্গে অন্যান্য খরচ (তেল, ড্রাইভার ও মেরামত বাবদ) রয়েছে। এরদিকে পাকিং ফিয়ের আদায়কৃত অর্থে পাবলিক পরিবহনের পেছনে ব্যয় করা যেতে পারে। পাবলিক পরিবহন ব্যবস্থা ভাল হলে, ভালো সার্ভিস থাকলে যাতায়াতের জন্য মানুষ পাবলিক পরিবহন ব্যবহার করবে। যা প্রাইভেট গাড়ির ব্যবহার হ্রাস করায় যানজট নিয়ন্ত্রণেও কার্যকরি ভূমিকা পালন করবে। দুটি প্রাইভেট কার একটি বাসের চেয়ে বেশি জায়গা নেয়। অথচ একটি বাসে প্রাইভেট গাড়ির তুলনায় ৩০ গুণ বেশি যাত্রী পরিবহন করা যায়। তবে প্রাইভেট গাড়ি নিয়ন্ত্রণের কথা ভাবতে গেলে বিকল্প পরিবহন তথা চলাচলের সুবিধা সৃষ্টির কথাও ভাবতে হবে।

ঢাকায় যানবাহন বাড়ছে ব্যাপকভাবে:
বিআরটিএতে প্রতিদিন গড়ে ২ শ’ থেকে ৩ শ’টি গাড়ির রেজিস্ট্রেশন হচ্ছে। এতে বোঝা যায়, প্রতিদিন ঢাকার রাসত্মায় কতগুলো গাড়ি নামছে। কিন’ প্রতিদিন কি ঢাকার রাস্তা বড় হচ্ছে ? তবে গাড়ি যারা নামাচ্ছে তারা প্রয়োজনেই নামাচ্ছে। এগুলো ব্যবহার করছে। মানুষ এসব গাড়ি তাদের প্রয়োজনেই ব্যবহার করছে। এত গাড়ি আছে, প্রতিদিন এত নতুন নতুন গাড়ি নামছে, এর পরও পাবলিক বাসে মানুষ সিট পাচ্ছে না। ঠেলাঠেলি করে এমনকি গেটে ঝুলে অনেকে ঝুঁকিপূর্ণভাবে এ নগরে চলাফেরা করছে। আর এ ধরনের অগণিত গাড়ির বহরে ভরে যাচ্ছে নগরের রাসত্মাগুলো। গাড়ির ভেতরে যেমন ভিড় মানুষের, বাইরেও তেমনি ভিড় গাড়ির। ফুটপাতগুলোয়ও কিলবিল করছে মানুষ। যানজট এবং জনজটের যেন এক অবিচ্ছেদ্য সহাবস্থান। এটিই আজ ঢাকা মহানগরীর বাস্তবতা। অসংখ্য ভাসমান মানুষ ভিড় করছে ফুটপাতে, পার্কে, খোলা জায়গায়। নিম্ন-আয়ের মানুষের স্বাভাবিক প্রয়োজনেই চালু থাকছে ফুটপাতের কেনাবেচা। বৈধ হোক আর অবৈধ হোক এটা বন্ধ করা কার্যত যে কঠিন, তা বহুবার প্রমাণিত হয়েছে। এমন একটি অবস্থা কল্পনা করুন ঢাকা শহরে কোনো যানবাহন থাকবে না বা সব মানুষ বা যাত্রীকে রাস্তায় রেখে কোনো এক অদৃশ্য শক্তিতে যানবাহন সব উধাও হয়ে গেল। তখন কী হবে? রাস্তায় মানুষের যে ঢল নামবে, তা কি কোনো ট্রাফিক পুলিশ এমনকি অন্য বাহিনী দিয়েও নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে?

বর্তমানে যানজট নিরসনে গুলিস্তান-যাত্রাবাড়ী ফাইওভার, এয়ারপোর্ট হইতে কুতুবখালী পর্যন- ২৬ কিঃমিঃ এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে, মিরপুর-এয়ারপোর্ট ফাইওভার, কুড়িল ফাইওভারসহ কয়েকটি প্রকল্প গ্রহণ করেছে। আমাদের হয়ত ধারণা উড়াল সড়ক নির্মাণ করা হলেই যানজট নিরসন হয়ে যাবে। এই ধরনের দীর্ঘ ও ব্যয়বহুল, সময়ব্যায়ী উড়াল সড়ক হয়ত কিছুটা গাড়ীর চাপ কমনোর উদ্দেশ্যে। আবার এই ধরনের সময়ব্যয়ী উড়াল সড়ক নির্মাণ করতে করতে আরও দ্বিগুণ চাপ সৃষ্টি হয়ে যাবে। একটা কথা হচ্ছে চাপ কমানো আর যানজট নিরসন এক নয়। আবার এই ধরনের প্রকল্প কতটি কত বছরে সম্ভব ? এতে তো যানজটের প্রকৃত সমাধান আসবে না।

অপর দিকে যদি বলতে হয়, গুলিস্তান-যাত্রাবাড়ীর কাজ সর্বপ্রথম ১৯৯৯সালে বর্তমান সরকার গ্রহণ করেছিল। পর্যায়ক্রমে সরকার পরিবর্তন ও নানা জটিলতায় আবার পুনারায় চালু হয়েছে এবং ২০১৩ সালে এর সমাপ্ত হওয়ার আশা। আবার কুড়িল ফাইওভার ২০১০সালে শেষ হওয়ার কথা থাকলেও বর্তমান সরকারের হাত দেওয়ার পর ৩ বছরের কাজ ১বছরে হয়ত ১৫% কাজের অগ্রগতি হয়েছে। হয়ত এই ধরনের প্রকল্প বাংলাদেশে নতুন কিন্তু’ উন্নত বিশ্বে বহু আগেই এগুলো নির্মাণ করে ফেলেছে। আমরা তাদের কাছ থেকে শুধু অণুকরণই করতে চেষ্টা করছি। একটু ভাবা উচিত নয় যে, তাদের এই প্রকল্প গ্রহণ করার ফলে কি তারা পরিপূর্ণ ভাবে যানজট নিরসন করতে পেরেছে ? চীন, জাপানসহ অনেক উন্নত ধনী রাষ্ট্রই তাদের পূর্ণ সমাধান এই ধরনের এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে এবং মেট্রোরেল দিয়েও দিতে পারেনি। এগুলো হয়ত পর্যাপ্ত সময় ব্যয় ও অর্থ ব্যয়ের বিনিময়ে নির্দিষ্ট নির্দিষ্ট গন্তব্যগুলোতে লিংক দেওয়া হয়েছে। তো সকল নির্দিষ্ট নির্দিষ্ট স্থানে তো সম্ভব নয়।

যদি এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে এবং মেট্রোরেলই যদি যানজটের সমাধান হয়ে যেত তাহলে তারা আর নতুন কিছু খুঁজত না। অপর দিকে যারা এই ধরনের উড়াল সড়ক নির্মাণ করে শহরকে ঘিরে ফেলেছে তাদের জন্য সহজভাবে প্রকৃত সমাধাণের পথও খুব কম বলে আমার ধারণা। দীর্ঘ দূরত্বের গাড়ী গুলো কিছুটা স্বল্প সময়ে যেতে পারলেও স্বল্প সময়ের যাতায়াতগুলো দীর্ঘ সময়েই যেতে হচ্ছে। কারণ বেশিরভাগ গাড়িগুলোই তো এই ধরনের উড়াল সড়ক ব্যবহার করতে পারবে না। তাহলে কেন আমাদের এই ধরনের ফর্মূলা গ্রহণ? আবার যদি আমাদের দেশের নির্মাণ সম্পন্ন মহাখালী ফাইওভার, খিলগাঁও ফাইওভার এবং কয়েকটি ওভারপাসের দিকে তাকাই তবে বলায় কি যে এই ধরনের ফাইওভার ঐ এলাকার যানজট নিরসন করতে পেরেছে ? নির্মাণের পূর্বে যে প্রত্যাশা ছিল সে প্রত্যাশা পূরণ হয়নি। আসলে এই ধরনের প্রকল্প দীর্ঘ সময় ও অর্থ ব্যয়ে শুধু নির্মাণই করা যাবে প্রকৃত সমাধান আসবে না হয়ত তাদের মতই।

যানজটের কারণে ঢাকার নাগরিক জীবনের কোনো সময়সূচি মেনে চলা সম্ভব হচ্ছে না। কর্মজীবী মানুষকে কর্মস্থলে যেতে এবং কাজ শেষে ফিরতে প্রতিদিন এতটা সময় ব্যয় করতে হচ্ছে যে, বিমানে করে সে সময়ে এক দেশ থেকে আরেক দেশে যাওয়া শুধু নয়, ফিরে আসাও সম্ভব। রাজধানীর যানজট নাগরিকদের মনোরাজ্যে প্রতিদিনই সৃষ্টি করছে বিরূপ প্রভাব। কেড়ে নিচ্ছে মনের শান্তি। অর্থনীতির জন্য সর্বনাশা প্রভাবও সৃষ্টি করছে এ সমস্যা। রাজধানীতে প্রতিটি যান্ত্রিক যানবাহনে যে পরিমাণ জ্বালানি তেল বা সিএনজি ব্যবহৃত হয়, তার প্রায় অর্ধেকটাই অপচয় ঘটে যানজটের কারণে। অথচ চরম বিরক্তিকর এ সমস্যা থেকে নগরবাসীকে রেহাই দেওয়ার তৎপরতা নেই বললেই চলে। রাজধানীর যানজট নিরসনে ট্রাফিক ব্যবস্থাকে গতিশীল করার প্রয়োজন সবচেয়ে বেশি। রাস্তায় খোঁড়াখুঁড়ির মহোৎসবেও লাগাম পরাতে হবে। সবচেয়ে বড় কথা, দেশের সবকিছুতে রাজধানীমুখী যে প্রবণতা রয়েছে তাতেও বাদ সাধতে হবে। সরকারি-বেসরকারি গুরম্নত্বপূর্ণ অফিসের বিকেন্দ্রীকরণ করেও ঢাকামুখী হওয়ার প্রবণতা রোধ করা সম্ভব।
যানজট নিরসনের কথা ভাববার আগে প্রশ্ন এস যায়, রাজধানীতে কত মানুষের নাগরিক সুবিধা দেয়া সম্ভব ? ঢাকা শহরের আয়তন অনুযায়ী সর্বোচ্চ ৩০ লাখ মানুষ বসবাস করতে পারে। অর্থাৎ এই শহরে সর্বোচ্চ ৩০ লাখ মানুষকে নাগরিক সুবিধা দেয়া সম্ভব। তাহলে ঢাকায় জনসংখ্যা কত? এ নিয়ে আছে সরকারী বেসরকারী বিভিন্ন সংস্থার ভিন্ন ভিন্ন বক্তব্য।

নগর পরিকল্পনাবিদরা বলছেন, ২০৩০ সালে রাজধানীতে জনসংখ্যা হবে দুই কোটি। ঢাকা সিটি করপোরেশন বলছে সোয়া কোটি। জাতিসংঘের সর্বশেষ রিপোর্ট অনুযায়ী বর্তমানে দেশের জনসংখ্যা ১৬ কোটি ২২ লাখ ২১ হাজার। বর্তমানে ঢাকায় লোক সংখ্যা এক কোটি ৩০ লাখ। ঢাকায় জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার ছয় শতাংশ। ১২ বছর পর ঢাকার জনসংখ্যা হবে প্রায় আড়াই কোটি। বিশ্ব ব্যাংকের মতে রাজধানীর বর্তমান পরিস্থিতিতে যানজট নিরসন অসম্ভব। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সরকারের একার পক্ষে কখনই যানজট নিরসন সম্ভব হবে না। এজন্য সর্বসাধারনের সহযোগিতা প্রয়োজন।

লেখক : সাংবাদিক, কলামনিষ্ট ও নিউজ-বাংলাদেশ ডটকমের সম্পাদক ,

মন্তব্য
  • মুহাম্মাদ ইকবাল হোছাইন সেপ্টেম্বর 4, 2012 at 12:56 অপরাহ্ন

    খুব খুব দরকারী একটি লেখা। লেখককে অন্তরের অন্তস্থল থেকে ধন্যবাদ। উড়াল সড়কগুলো নির্মান হচ্ছে টাকা খাওয়ার ধান্দা। জাতির বিবেক বলে যাদের আমরা জানি তারাও চুপ মেরে থাকে। বিরোধী দল নামক জালিমরাও ঐ একই পথের পথিক। এই অবস্থায় আপনার এই দীর্ঘ তথ্যসমৃদ্ধ লেখাটি তাদের টনক নাড়বে বলে আশা করছি। আপনার সার্বিক কল্যান কামনা করছি।

  • কে আই তাজ সেপ্টেম্বর 3, 2012 at 5:36 অপরাহ্ন

    জনাব মীর আব্দুল আলীম- বটে !!
    ঢাউস আকৃতির লেখনী- ধৈর্য নিয়ে পড়লাম। সে ধৈর্য বিফলে যায়নি। অনেক প্রস্তাব তুলে এনেছেন।
    আমাদের দেশে অসুবিধা হল সিস্টেম লস। যে কোন অসঙ্গতির ক্ষেত্রেই চেইনের মত হুড়মুড় করে ভেঙে পড়ে যাবতীয় ব্যবস্থা। তাই প্রশ্ন থেকেই যায়, কোন অংশে আগে হাত দেওয়া ফলপ্রসূ- নতুন পদ্ধতি গ্রহণ, নাকি বিদ্যমান অবস্থার উত্তরণ। যাই হোক, সুদিনের অপেক্ষায় আছি। আপনাকে শুভেচ্ছা।

  • leya sharker সেপ্টেম্বর 3, 2012 at 5:31 অপরাহ্ন

    Alim ভাই , খুবই ভালো লাগলো, অনেক ধন্যবাদ । যানজট কমানো খুবই জরুরী । সরকার সহ সকলের সম্মিলিত পদক্ষেপ দরকার ।
    ভাল থাকুন এবং নিরাপদে পথ চলুন।

  • সোলাইমান ইসলাম নিলয় সেপ্টেম্বর 3, 2012 at 3:40 অপরাহ্ন

    তথ্য বহুল একটি পোষ্ট। খুবই ভালো লাগলো। সরকারের ইচ্ছা, সৎ ও দক্ষ স্থানীয় প্রশাসন, জনসাধারনের সচেতনতা এবং অংশ গ্রহন ছাড়া ঢাকা শহরের জানজট নিরসন সম্ভব নয়।

  • A LIBRARY OF RURAL DEVELOPMENT(SAYED CHOWDHURY) সেপ্টেম্বর 3, 2012 at 12:17 অপরাহ্ন

    ছোট ছোট ফ্লাই ওভারের আইডিয়াটা খুবই কার্যকর । ক্রসিংয়ের জন্য গাড়ি দাঁড়াতে না হলে যানজট অনেক কমে যাবে । আপনাকে অনেক ধন্যবাদ দিকনির্দেশনা যুক্ত এ পোষ্টের জন্য । ভালো থাকবেন ।

  • Rabbani Chowdhury সেপ্টেম্বর 2, 2012 at 3:30 অপরাহ্ন

    মূল্যবান পোষ্ট, সকলের সহযোগীতা প্রয়োজন।

© বদলে যাও, বদলে দাও!